প্রয়োজনে ফোন করুন:
+88 01978 334233

ভাষা পরিবর্তনঃ

Cart empty

নামকরণের ইতিহাসঃ কুষ্টিয়া চুয়াডাঙ্গা মেহেরপুর - বিলু কবীর

(পড়তে সময় লাগবেঃ-: 11 - 22 minutes)

১৯৪৭ সালে দেশবিভাগকালে মুসলিম সংখ্যাধিক্যের এলাকা হিসাবে কুষ্টিয়া তৎকালীন পূর্বপাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত হয়। অবিভক্ত ব্রিটিশ শাসনকালে কুষ্টিয়া জনপদটি ছিল প্রেসিডেন্সি বিভাগের নদীয়া জেলার অংশ। উক্ত ১৯৪৭ সালের ৭ আগস্টে অবিভক্ত নদীয়া জেলার পাঁচটি মহকুমার মধ্য হতে কুষ্টিয়া, চুয়াডাঙ্গা, মেহেরপুর নিয়ে কুষ্টিয়া জেলার জন্ম হয়।

প্রথমে নবগঠিত এই জেলার নাম রাখা হয় মূল জেলার নামে ‘নদীয়া'। আর নদীয়ার যে অংশ পশ্চিমবাংলায় রয়ে যায়, তার নাম দেয়া হয় “নবদ্বীপ” জেলা। কিন্তু এতে প্রাশাসনিক জটিলতা দেখা দিলে প্রথম জেলা ম্যাজিস্ট্রেট সৈয়দ মুর্তাজা আলী পূর্বপাকিস্তানে পরা এই অংশের নাম ‘নদিয়া জেলা’র পরিবর্তে কুষ্টিয়া রাখেন। একই সাথে পশ্চিমবাংলার অংশের নামও ‘নবদ্বীপ জেলা’র পরিবর্তে পূর্বনাম ‘নদীয়া’ রাখা হয়। অবিভক্ত নদীয়ার শেষ জেলা ম্যাজিস্ট্রেট ছিলেন এ.এম. নাসির উদ্দিন।

পূর্বনাম ‘নবদ্বীপ’ এবং পরবর্তী নাম ‘নদীয়া'। এই নামকরণ বিষয়ে একটি প্রবাদ বা চলতি প্রবচন রয়েছে। দূর অতীতে তান্ত্রিক ঋষি-ঋত্বিকেরা বসবাস করতেন এই দ্বীপে। তারা নয়টি দ্বীপ বা বাতি জ্বালিয়ে তান্ত্রিক যােগ-সাধনা করতেন বলে স্থানটি নয়া-দীয়া বা নদিয়া বা নবদীপ বলে পরিচিত হয় (দীয়া অর্থ প্রদীপ)। মতান্তরিত লােকালেখ্য হলােঃ এই জনপদটি নয়টি দ্বীপ-এর সমন্বয়ে সৃষ্টি হয়েছিল বলে এর নাম ন’দ্বীপ > নদ্বীপ > নবদ্বীপা > নদীয়া।

একদা কুষ্টিয়া ছিল পাবনা জেলার কুমারখালী মহকুমার একটি জনপদ এবং নদীবন্দর। তবে ১৮৬২ সালে আনুষ্ঠানিক ভাবে কুষ্টিয়া মহকুমা হয় এবং প্রশাসনিক কাজকর্ম শুরু হয়। এর দুই বছর আগে অর্থাৎ ১৮৬০ সালে পাবনার এক নীল চাষি সমাবেশে কুষ্টিয়াকে মহকুমা হিসাবে রূপান্তরিত করার ঘোষণা দেয়া হয়। বাংলার লেফটেন্যান্ট গভর্নর জন পিটার গ্র্যান্ট এই ঘোষণা দেন। এর আগে অবশ্যি কুষ্টিয়া ‘থানা’র মর্যাদা পেয়েছিল এবং মজমপুরে তার পুলিশস্টেশন ছিল। পাবনাভুক্ত আমলে এই থানার সৃষ্টি হয়েছিল ১৮৫৯ সালে। তার আগে ১৮২৩ সালে যশোর এবং ১৮২৮ সালে পাবনার জনপদ ছিল।

কাকবান্দাল’ বলে একটি স্থাননামের হদিশ পাওয়া যায়। এটিই কুষ্টিয়ার আদি নাম বলে ক্ষীণতথ্য মেলে। তবে এই প্রাচীন ‘কাকবান্দাল’ বিষয়ে সুস্পষ্ট কোনো তথ্য নেই। কুষ্টিয়া জেলার নামকরণ বিষয়ে সুস্পষ্ট ভাবে নিশ্চিত কোনো পটভূমি-তথ্য জানা যায় না। ‘কুষ্টিয়া' নামের কোন মৌজারও হদিশ মেলে না। এখন যে কুষ্টিয়া বা কুষ্টিয়া শহর, তা আসলে কোনো আমলের নতুন কুষ্টিয়া। কালে যা কুষ্টিয়া বা স্থানান্তরিত ‘কুষ্টিয়া’ হয়েছে। ‘পুরাতন কুষ্টিয়া’ বলে একটি গ্রামের অস্তিত্ব এখনও বর্তমান। বর্তমান কুষ্টিয়া শহর হতে গড়াই নদীর অপর পাড়ে হরিপুর। হরিপুর হতে পাবনার দিকে যেতে একেবারে পদ্মা নদীর এ পারে পুরাতন কুষ্টিয়া গ্রাম, পদ্মার ওপারেও সামান্য অংশ কুষ্টিয়া, তারপরে পাবনা। নতুন কুষ্টিয়া বা বর্তমান কুষ্টিয়া হবার আগে এই পুরাতন কুষ্টিয়াই যে “কুষ্টিয়া” ছিল তা সহজেই অনুমান করা যায়।

এই ধারনাকে অধিক গ্রহণযোগ্য মনে করা হয় যে, ঐ কুষ্টিয়া গ্রামের নামেই “কুষ্টিয়া” নাম হয়েছে এবং “কুষ্টিয়া” শব্দটি এসেছে “কুষ্টা” থেকে। পাট বা বাংলার সোনালী আঁশকে এতদঞ্চলে আঞ্চলিক ভাষায় কুষ্টা বা কুষ্টে বলা হয়। একদা এবং এখনও কুষ্টিয়ায় উল্লেখযোগ্য পরিমাণ পাট বা কুষ্টার আবাদ হয়।

‘এও দিন যাবি;
কুষ্টা দিয়ে চুল বাঁদে যে।
সেও ভাতার পাবি।

অঞ্চলের এই লােকজ ছড়াটির মধ্যে কুষ্টার সহজলভ্যতা বা প্রাচুর্যের চিত্র পাওয়া যায় । পোড়াদহের কাছে পাটখড়ি’র হাট’ও সাক্ষ্য দেয় যে, এ অঞ্চলে একদা প্রচুর পাট জন্মাতো ষোড়শ শতাব্দীর কবি মুকুন্দরাম-এর চণ্ডীমঙ্গল কাব্যের নিম্নলিখিত পদে কুষ্টিয়া’র (কুচা নগর) উল্লেখ পাওয়া যায়ঃ

বহিয়া গড়াই নদী সদাই স্মরিয়ে বিধি
তেঁউটায় হইনু উপনীত।
দারুকেশ্বর তরি পাইল বাতন-গিরি
গঙ্গাদাস বড়ো কৈলা হিত॥
নারয়ণ পরাশর এড়াইল দামোদর
উপনীত কুচট্টা নগরে।

১৮২০ সালে প্রকাশিত হেমিলটনের ‘ইন্ডিগো গেজেটিয়ার’এ ‘Kustee’র উল্লেখ লক্ষ্য করা যায়। সৈদয় মুর্তাজা আলীর মতে ফার্সি শব্দ কুশতহ (যার অর্থ ছাইদ্বীপ) বা কুস্তা থেকে কুষ্টিয়া শব্দটি এসেছে। কেউ কেউ মনে করেন কুস্তি’ খেলা থেকেও কুস্তিয়া > কুষ্টিয়া নামটি আসতে পারে। তবে এই শেষােক্ত যুক্তি বা অনুমানটি দুর্বল ইতিহাস বা প্রতুসংস্কৃতির সমর্থক নয় বলা যেতে পারে। একবার কুষ্টিয়া’র নাম পরিবর্তন করে ‘লালনশাহী জেলা রাখার কথা উঠেছিল। ১৯৬২ সালে মৌলানা মেছবাহুর রহমান এই প্রস্তাবের প্রতিবাদ করেন। এ বিষয়ে একটি প্রচারপত্রও বিতরণ করা হয়েছিল। নবাব মুর্শিদকুলী খানের (সি. ১৬৬৫-১৭২৭) আমলে কুষ্টিয়া এলাকার নাম ‘গোপীনাথাবাদ’ ছিল বলে মনে করা হয়, (জেলায় গােপিনাথ মন্দির আছে)। শ.ম. শওকত আলী তার কুষ্টিয়ার ইতিহাস গ্রন্থে লিখেছেনঃ-

-- কুষ্টিয়া নামকরণের সঠিক ইতিহাস জানা যায় না। বর্তমান কুষ্টিয়ায় এই নামের কোনাে মৌজা নাই। শহরটি বাহাদুরখালী ও মজমপুর মৌজার উপর অবস্থিত। নদীর উত্তর পাড়ে দুই মাইল মত পশ্চিম-উত্তর কোণে পুরাতন কুষ্টিয়া গ্রাম। ঐ গ্রামে পুরাতন ইটের রাস্তার চিহ্ন দেখে মনে হয় ঐটি ছিল আসল কুষ্টিয়া। দুই শতাধিক বছর পূর্বে পদ্মার স্রোত গড়াইয়ের দিকে প্রবাহিত হওয়ার সময় বর্তমান থেকে উক্ত পুরাতন কুষ্টিয়া গ্রামকে বিচ্ছিন্ন করে দেয়। পরে নদী উত্তরে সরে যেয়ে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত হলে একটি কোল ফেলে যায়। শতাধিক বছর পর্বে গড়াইনী ডাকদহের মােহনা থেকে প্রবাহিত হয়ে এখনও বয়ে চলেছে। ১৮১০ সালে প্রকাশিত হেমিলটনের ইণ্ডিগো গেজেটিয়ার'এ 'Kustee' বা কুষ্টি' বানানে এই স্থানের উল্লেখ পাওয়া যায়। স্থানীয় লোকেরা এখনও কুষ্টিয়াকে ‘কুইষ্টে' বা কুষ্টে' বলে। সৈয়দ মুতাজা আলী লিখেছেন : 'কুষ্টিয়া শব্দটি ফারসী কুশত বা কুস্তা থেকে এসেছে। কোষ্টা বা পাট থেকে এ নামকরণ হতে পারে।'

কুষ্টিয়া শব্দটির প্রাচীন বানান লক্ষ্য করে ধারণ করা হয় কষ্টা বা কুস্তি' (বেলা) কিংবা ফার্সি কুস্তা থেকে কুষ্টিয়া শব্দটি এসেছে। তবে কুষ্টা বা কুস্তি খেলা থেকে ‘কুষ্টে' (Kustee) বা কুষ্টিয়া (Kustea, Kushtia) প্রভৃতি বানান ও উচ্চারণ এসেছে। এ জেলায় এককালে প্রচুর পাট হতাে, আবার কুস্তি অত্যন্ত জনপ্রিয় খেলা ছিল এবং এখনও তার কিছু দৃষ্টান্ত মেলে। নবাব মুর্শিদকুলী খানের (সি. ১৬৬৫-৩০.৬.১৭২৭) আমলে কুষ্টিয়ার নাম নাকি ছিল গােপীনাথাবাদ। তখন স্থানটি অগ্রদ্বীপ পাটুলীর জমিদারি এলাকা ছিল। প্রতিবছর গোপিনাথ জিউয়ের রথের মেলায় নাকি লক্ষাধিক লোক জমায়েত হতাে এবং অত্যধিক ভিড়ের চাপে পায়ের তলায় পিষ্ট হয়ে অনেক লােক মারা যেতাে। এ ঘটনায় নবাব রাগান্বিত হয়ে জমিদারি এলাকা কৃষ্ণনগর রাজাকে প্রদান করেন। কৃষ্ণনগর রাজা পার্শ্ববর্তী অনেকগুলি গ্রাম গোপিনাথ জিউরের সেবায় দান করে স্থানটির নাম গোপিনাথবাদ রাখেন।

উল্লেখ্য যে, কুষ্টিয়া সম্রাট শাহজাহানের (১৫৯২-১৬৬৬) সময়ে নদীবন্দর ও নৌঘাঁটি হিসাবে গড়ে ওঠে। যা ব্রিটিশ ইস্টইন্ডিয়া কোম্পানির আমলে কুমারখালীর একটি নদীবন্দর হিসাবে পরিচিতি পায়। শহর কুষ্টিয়া গড়ে ওঠার পেছনে নীলকরদের বাণিজ্যিক প্রয়ােজন মূল হেতু হিসাবে কাজ করেছিল। ১৮৬০ সালে কুষ্টিয়াকে মহকুমা করার কথা ঘােষিত হয়। ১৮৬২ সালে জনপদটি আনুষ্ঠানিক ভাবে মহকুমা হয়। ১৯৪৭-এ জেলা হয়। ১৯৭১-এ ১০ মার্চে জেলার মহকুমা মেহেরপুরের বৈদ্যনাথ তলায় ভবের পাড়ায় বিপ্লবী স্বাধীন বাংলাদেশ সরকার গঠিত হয় এবং সে স্থানের নাম দেয়া হয় “মুজিবনগর”।

চুয়াডাঙ্গা বাংলাদেশের অন্যতম সীমান্তবর্তী জেলা। এই জেলার নামকরণ বিষয়ে একাধিক তথ্যবহতা লক্ষ্য করা যায়। মুখপরম্পরায় চলতি তথ্যকথনে জানা যায় যে, ১৭৪০ সালের দিকে ভারতের মুর্শিদাবাদ জেলার নদীয়া সীমান্তের গ্রাম ইটেবাড়ি মহারাজপুর হতে মাথাভাঙ্গা নদীপথে এতদঞ্চলে সপরিবার চলে আসেন জনৈক চুঙ্গে৷ মল্লিক। যিনি মল্লিক বংশের আদি পুরুষ। উক্ত চুঙ্গো মল্লিক এখানে প্রথম বসতি স্থাপন। করেন বলে তারই নামানুসারে জনপদের নাম হয় 'চুঙ্গোডাঙ্গা'। এটি মাথাভাঙ্গা ও নবগঙ্গা নদীর মধ্যবর্তী এলাকা। ১৭৯৭ সালের যে ভূমি রেকর্ড, তাতে এ জায়গাটির নাম ‘চুঙ্গোডাঙ্গা (Chungodanga) বলে উল্লেখ রয়েছে। এই আলােচনাসংশ্লিষ্ট আরেকটি তথ্য পাওয়া যায়, তাহলো : একদা এখানে ‘চুংগা মল্লিক’ নামে জনৈক প্রতিপত্তিশালী ব্যক্তি ছিলেন। তারই নামে চুংগাডাঙ্গা > চুঙ্গাডাঙ্গা > চুয়াডাঙ্গা নামটির প্রচলন হয়।

চুঙ্গো মল্লিকের নাম থেকে যে চুঙ্গোডাঙ্গা হয়ে চুয়াডাঙ্গা নাম শব্দটির উৎপত্তি ঘটেছে, সে বিষয়ে কিছুটা অন্যরূপ একটি কিংবদন্তির চল লক্ষ্য করা যায়। কথিত আছে যে, “চুঙ্গো মল্লিক” নয়, বরং লােকটির নাম ছিল ‘চুয়া মল্লিক’। ইনি ছিলেন রাখাল। এই চুয়া মল্লিক নবাব আলীবর্দী খার হরিণ চুরি করে ধরা পড়েন। এই অপরাধে তাকে সপরিবার মুর্শিদাবাদ থেকে নির্বাসনে দেয়া হয়। তখন তিনি এতদঞ্চলে এসে প্রথম বসতি স্থাপন করলে তারই নামে এলাকার নাম হয় “চুয়াডাঙ্গা”। অথবা তার নাম যাই হােক, তিনি নির্বাসনে এসে এলাকার জঙ্গল চুয়া করে (পরিষ্কার করে) বসতি স্থাপন করেন বলে এই এলাকার নাম হয় চুয়াডাঙ্গা বা পরিষ্কারভুমি।

কেউ কেউ মনে করেন যে, মূল ফার্সি উচ্চারণ হতে ইংরেজিতে লেখায় এর নাসিকাবর্ণ N লোপ পেয়ে চুঙ্গাডাঙ্গা > চুয়াডাঙ্গা হয়ে চুয়াডাঙ্গা’য় পর্যবসিত হয়। উল্লেখ্য স্থানিক অভ্যাসে পুরাতন লােকেরা, এমনকি নব্যরাও কেউ কেউ এই জেলাকে আদর করে চুঙ্গাডাঙ্গা বা চুঙোডাঙা বলে থাকেন।

অন্য একটি প্রচলিত লােকশ্রুতি এই যে, স্থানীয়ভাবে ‘চুয়া' শব্দের অর্থ হচ্ছে পরিষ্কার। কেউ এখানে বসতি স্থাপনের জন্য জঙ্গলাদি কেটে পরিষ্কার বা চুয়া করেন বলে এলাকটি চুয়াডাঙ্গা' নামে চিহ্নিত হতে থাকে।

আবার এমন কথারও প্রচলন রয়েছে যে, হিন্দি ‘চুয়াহ্' শব্দের অপভ্রংশ ‘চুয়া'র উচ্চারণ এখানে প্রচলিত। বৃহত্তর কুষ্টিয়া অঞ্চলেই ‘চুয়া' শব্দের অর্থ হচ্ছে ‘ইদুর'। নদীবেষ্টিত এই জায়গাটি উচু হওয়ায় নিয়ত বর্ষা-বন্যার উপদ্রপমুক্ত বলে এখানে প্রচুর চুয়া বা ইদুরের অস্তিত্ব ছিল। এই কারণেই এলাকাটির নাম চুহাডাঙ্গা > চুয়াডাঙ্গা হয়। ইদুরের আধিক্য দেখেই নাকি প্রথম বসতি স্থাপনকারী চুঙা মল্লিক অনুমান করেছিলেন যে, এই ভাটি-অঞ্চলটি উঁচু, যা বন্যা-প্লাবনে জলমগ্ন হয় না। এই বিবেচনা থেকেই তিনি এখানে বসতি স্থাপনে উৎসাহী হয়েছিলেন।

স্থানীয়ভাবে চুয়া-র বিকৃত উচ্চারণ 'চয়া’ মানেও পরিষ্কার বা চষা জমি। এই চয়া থেকে চয়াডাঙ্গা হয়ে পরবর্তীতে কালের পরিক্রমায় উচ্চারণ বিকৃতিতে ‘চুয়াডাঙ্গা শব্দটি এসে থাকতে পারে।

চুয়াডাঙ্গার প্রথম সদর দপ্তর ছিল দামুরহুদায়। ১৮৬২তে সদর মহকুমা চুয়াডাঙ্গায় চলে আসে। ১৮৯২এ চুয়াডাঙ্গাকে মেহেরপুরের সাথে সংযুক্ত এবং ১৮৯৭ সালে পুনরায় পৃথক করা হয়। ১৯০৩ সালে চুয়াডাঙ্গা মহকুমাকে বিলুপ্ত করার প্রস্তাব উত্থাপিত হলেও তা কার্যকর হয়নি। ১৯৪৭ সালে দেশ বিভাগের ফলে চুয়াডাঙ্গা কুষ্টিয়া জেলার একটি মহকুমার রূপলাভ করে। ১৯৮৪ সালে এই মহকুমা জেলার মর্যদা লাভ করে।

স্বাধীন বাংলাদেশ সরকারের প্রথম সূর্যোদয় ঘটেছিল মেহেরপুরে, ১০ এপ্রিল ১৯৭১ তারিখে। মেহেরপুর তখন ছিল কুষ্টিয়া জেলার মহকুমা। এই জেলার নামকরণ নিয়ে কয়েকটি আনুমানিক সিদ্ধান্ত বা সম্ভাব্যতার প্রচলন লক্ষ্য করা যায়।

অনুমান করা হয় যে, জনৈক দরবেশ মেহের আলী'র নামানুসারে মেহেরপুর জেলার নামকরণ হয়। বলা হয় ইসলামধর্ম প্রচারের উদ্দেশ্যে ষােড়শ শতকে (মতান্তরে পঞ্চদশ শতকের শেষপাদে) শাহ ভালাই, শাহ আলাই, আয়েক উল্লাহ এবং আরও কয়েকজন বুজুর্গ মানুষ এতদঞ্চলে এসেছিলেন। এই আধ্যাতবিক শক্তি সমৃদ্ধ ধর্ম প্রচারক এখানে গভীর ধ্যানে মগ্ন হলে দরবেশ মেহের আলীর বিদেহী আত্নার নৈকট্য লাভ করেন। তারা তখন এই দরবেশ মেহের আলীর নামে এলাকার নামকরন করেন মেহেরপুর। কিন্তু এর আগে এই জায়গার নাম কি ছিল সে বিষয়ে জানা যায় না। কেউ কেউ বলেন যে, দরবেশ শাহ ভালাই’ই আসলে দরবেশ মেহের আলী। ভালাই তার ডাক বা চলতি নাম। তারই নামে মেহেরপুরের নামকরন করা হয়েছে। উপরোক্ত প্রচলিত মতে এটা সহজেই অনুমান করা যায় যে, ষোড়শ শতাব্দী বা পঞ্চদশ শতাব্দীর পূর্বে মেহের আলীর অস্তিত্ব ছিল না। কিন্তু এমনও মতামত পাওয়া যায় যে, ঐ সময় মেহেরউল্লাহ শাহ্ নামক একজন জনপ্রিয় সমাজসেবক বাস করতেন। তারই নামে এই জনপদের নাম মেহেরপুর রাখা হয়।

অপর একটি কিংবদন্তি হলো, এই মেহেরপুর নামটি যার নামে রাখা হয়, তিনি হলেন বিখ্যাত সমাজ সংস্কারক এবং সাধুপুরুষ মুন্সি মেহেরউল্লাহ্।

অপর পক্ষে বাংলায় ভ্রমণ গ্রন্থে গ্রন্থাকার অমীয় বসু উল্লেখ করেছেন যে, মিহির এবং তার স্ত্রী খনা এই এলাকায় বসবাস করতেন। আলোচ্য মিহির-এর নাম অনুসারেই “মিহিরপুর” নামের উৎপত্তি। পরে উচ্চারণ পরম্পরায় তা মেহেরপুর’এ রুপ লাভ করে। কিংবদন্তি হলেও সেই প্রেক্ষিত ধরে এমনটাই জানা যায় যে, খনা এবং তার স্বামী মিহির পশ্চিমবাংলার চব্বিশপরগনা জেলার বারাসাতে বাস করতেন। তাদের গ্রামের নাম ছিল ‘দেউলি'। এই মূল্যায়নে এবং যুক্তিনির্ভর সমর্থনযােগ্য তথ্যের অভাবে স্বাভাবিকভাবেই বিতর্কের যথেষ্টই অবকাশ রয়েছে। আদপে মিহির-খনার বসবাস মেহেরপুর অঞ্চলে ছিল কিনা। কেউ কেউতো এমনও বলেন যে, খনা মূলত একটি কাল্পনিক চরিত্র। আসলে ‘খনা’ বলতে আবহমান ক্ষণ/কালকে বা ‘খনার বচন’ বলতে কালের মুখচলতি কাব্য বা শ্লোককে বোঝানো হয়।

ব্রিটিশ শাসনের অবিভক্ত ভারত আমলে মেহেরপুর নদীয়া জেলার অন্তর্ভুক্ত ছিল। ১৯৪৭ সালে দেশ বিভাগ হলে, একে নদীয়া থেকে কেটে কুষ্টিয়ার অধীনে আনা হয়। এই সময়ে মেহেরপুর এবং গাংনী থানা দুটি চুয়াডাঙ্গা মহকুমার সাথে প্রাশাসনিক সংযুক্ততা পায়। ১৯৫১ সালে এই মেহেরপুর এবং গাংনী থানা দুটিকে চুয়াডাঙ্গা থেকে পৃথক করে মেহেরপুর মহকুমার পত্তন ঘটানাে হয়। ৩৩ বছরের মাথায়, ১৯৮৪ সালে মেহেরপুর মহকুমা পূর্ণাঙ্গ জেলার মর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত হয়।

তথ্যনির্দেশ:- বাংলাদেশের জেলা : নামকরণের ইতিহাস। বিলু কবীর, প্রকাশক সিকদার আবুল বাশার, গতিধারা, ৩৮/২ক বাংলাবাজার, ঢাকা ১১০০, এপ্রিল ২০১০, পৃষ্ঠা ২২১-২৩০

বিলু কবীর : এই গ্রন্থের সম্পাদক।

মন্তব্য

মানুষ এবং সমাজের ক্ষতিসাধন হয় এমন মন্তব্য হতে বিরত থাকুন।


Close

নতুন তথ্য

আমাদের ঐতিহ্য নতুন তথ্য

Subscribe Our Newsletter

welcome to our newsletter subscription

প্রতিষ্ঠাতা এবং প্রকাশকঃ- সালেকউদ্দিন শেখ সুমন

We Bangla

Go to top

>