Support:
+88 01978 334233

Language Switcher:

Cart empty

কবি আজিজুর রহমান

(Reading time: 6 - 12 minutes)

আজিজুর রহমান (জন্ম: অক্টোবর ১৮, ১৯১৪ মৃত্যু: সেপ্টেম্বর ১২, ১৯৭৮) একজন বাংলাদেশী কবি এবং গীতিকার। তিনি ১৯৭৯ সালে একুশে পদক লাভ করেন।

দেশের সর্বোচ্চ সম্মান ‘একুশে পদক’ প্রাপ্ত কবি আজিজুর রহমানের মৃত্যুর ৩৬ বছর পার হলেও সরকারিভাবে তার স্মৃতি সংরক্ষণ ও স্মৃতিচারণে নেয়া হয়নি কোনো পদক্ষেপ। অবহেলিত অবস্থায় পড়ে আছে তার বাস্তুভিটা ও সমাহিত চত্বর। নিশ্চিহ্ন হতে বসেছে তার সমাধিস্থলসহ সকল স্মৃতিময় স্থান ও কর্মকাণ্ড। তবে হাটশ হরিপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যানসহ সর্বস্তরের সচেতন নাগরিকদের নিয়ে একটি উদযাপন কমিটি গঠন করা হয়েছে।

কবি আজিজুর রহমান প্রায় ৩ হাজারের অধিক গান লিখেছেন। তার জনপ্রিয় গানগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য-

‘ভবের নাট্যশালায় মানুষ চেনা দায় রে’,
‘কারো মনে তুমি দিও না আঘাত,
সে আঘাত লাগে কাবার ঘরে’,
‘আকাশের ঐ মিটি মিটি তারার সাথে কইবো কথা, নাই বা তুমি এলে’,
‘পৃথিবীর এই পান্থশালায়, হায় পথ ভোলা কবি’,
‘আমি রূপনগরের রাজকন্যা রূপের জাদু এনেছি’,
‘বুঝি না মন যে দোলে বাঁশিরও সুরে’,
‘দেখ ভেবে তুই মন, আপন চেয়ে পর ভালো’,
‘পলাশ ঢাকা কোকিল ডাকা আমারই দেশ ভাই রে’ প্রভৃতি।
কবি আজিজুর রহমান
কবি আজিজুর রহমান

অথচ এই জনপ্রিয় গানগুলো আজ সংরক্ষণের অভাবে হারিয়ে যেতে বসেছে। তাই কবির গানগুলো সংরক্ষণের উদ্যোগ নেয়ার জন্য এবং প্রতিবছর সরকারিভাবে জেলা প্রশাসনের তত্ত্বাবধানে কবি আজিজুর রহমানের জন্ম ও মৃত্যু দিবস পালনের জোর দাবি জানান এলাকাবাসী।

একুশে পদকধারী কবি, গীতিকার ও বেতার ব্যক্তিত্ব আজিজুর রহমান ১৯১৪ সালের ১৮ই অক্টোবর কুষ্টিয়া সদর উপজেলার হাটশ হরিপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতার নাম বশির উদ্দিন প্রামানিক, মাতার নাম সবুরুন নেছা। গড়াই নদীর নৈসর্গিক সৌন্দর্য তাকে সব সময় মোহিত করে রাখত। ১৩ বছর বয়সে, ১৯২৭ সালে তিনি পিতাকে হারান। উচ্চশিক্ষা লাভের ভাগ্য না থাকলেও প্রবল ইচ্ছা ও অনুসন্ধিৎসার ফলে বহু বিষয়ক পুস্তকাদি স্বগৃহে পাঠ করে তিনি একজন স্বশিক্ষিত ব্যক্তিতে পরিণত হন।

সাহিত্যচর্চা শুরুর আগে নাটকে অভিনয়ে তার উৎসাহ ছিল বেশি। তিনি গড়ে তোলেন একটি নাট্যদল। নাট্যদলটি নাটক মঞ্চস্থ করত শিলাইদহের ঠাকুর বাড়িতে। এ কাজের জন্য সে সময় কুষ্টিয়ার সাংস্কৃতিক অঙ্গনে তার সুনাম ও খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে। সে কালের বিশিষ্ট অভিনেতা ধীরেন দত্ত, উপেশ ঠাকুরসহ বিভিন্ন নামিদামি অভিনেতারা অংশগ্রহণ করতেন তার নাট্যদলে। সমাজসেবায় কবি ছিলেন একজন নিবেদিত প্রাণ।

১৯৩১ সালে ১৭ বছর বয়সে কবি ঝিনাইদহ জেলার শৈলকুপা উপজেলার ফুলহরি গ্রামের এজহার শিকদারের মেয়ে ফজিলাতুন নেছাকে বিয়ে করেন। তিনি ৩ ছেলে ৪ মেয়ের জনক।

১৯৩৪ সালে তিনি তার পিতামহ চাঁদ প্রামানিকের নামে হরিপুর গ্রামে গড়ে তোলেন চাঁদ স্মৃতি পাঠাগার। এটি অত্যন্ত সমৃদ্ধ একটি পাঠাগার ছিল। দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ বইয়ের খোঁজে আসতেন এই পাঠাগারে। তার সাংগঠনিক ক্ষমতা ছিল প্রবল।

তিনি একাধারে কুষ্টিয়া হাটশ হরিপুর ইউনিয়ন বোর্ডের চেয়ারম্যান, কুষ্টিয়া (নদীয়া) ফুড কমিটির সেক্রেটারি, বেঞ্চ অ্যান্ড কোর্ট ডিভিশনের চেয়ারম্যান, কুষ্টিয়া জেলা বোর্ড ও ডিস্ট্রিক্ট অ্যাডভাইজরি কমিটির সদস্যের পদও অলঙ্কৃত করেছিলেন। ছাত্র থাকা অবস্থায় মুসলিম ছাত্র আন্দোলনেও ভূমিকা রেখেছেন এবং প্রাদেশিক মুসলিম লীগের সদস্য মনোনীত হয়েছিলেন। তিনি প্রায় ৩০০-এর উপরে কবিতা রচনা করেছেন। তার মধ্যে নৈশনগরী, মহানগরী, সান্ধ্যশহর, ফেরিওয়ালা, ফুটপাত, তেরশপঞ্চাশ, সোয়ারীঘাটের সন্ধ্যা, বুড়িগঙ্গার তীরে, পহেলা আষাঢ়, ঢাকাই রজনী, মোয়াজ্জিন, পরানপিয়া, উল্লেখযোগ্য। এ কবিতাগুলো এক সময় নবযুগ, নবশক্তি, আনন্দবাজার পত্রিকা, শনিবারের চিঠি, সওগাত, মোহাম্মাদী, আজাদ, বুলবুল পত্রিকায় নিয়মিত ছাপা হতো।১৯৫৪ সালে তিনি ঢাকা বেতারে প্রথমে অনিয়মিত এবং পরে নিয়মিতভাবে যোগ দেন। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি বাংলাদেশ বেতারে চাকরীতে বহাল ছিলেন।

ঢাকায় গিয়ে তিনি কবি ফররুখ আহমদের সহায়তায় বিভিন্ন শিল্পী, কবি ও সাহিত্যিকদের সাথে পরিচিত হন। এসময় কবি ফররুখ আহমদ তাকে ঢাকা বেতারে নিয়ে যান।

১৯৫৪ সালে কবি আজিজুর রহমান ঢাকা বেতারে গীতিকার হিসেবে অনুমোদন পান। বেতারের সাথে যোগাযোগ কবি আজিজুর রহমানের সাহিত্যিক জীবনের এক উল্লেখযোগ্য ঘটনা। কবি আজিজুর রহমান কবিতা দিয়ে যাত্রা শুরু করলেও গান রচনার মধ্যে তার প্রতিভার পূর্ণ প্রকাশ ঘটে। তিনি প্রায় ৩ হাজার গান লিখেছেন, যা আজও আমাদের দেশের মানুষের কাছে অত্যন্ত জনপ্রিয়।

সাংবাদিকতার ক্ষেত্রেও আজিজুর রহমানের কিছু পরিচয় আছে। অধুনালুপ্ত দৈনিক পয়গম পত্রিকায় ১৯৬৪ থেকে ১৯৭০ পর্যন্ত সাহিত্য বিভাগের সম্পাদক ছিলেন তিনি। ঢাকা থেকে প্রকাশিত কিশোর মাসিক 'আলপনী'রও সম্পাদক ছিলেন তিনি। কবি আজিজুর রহমানই প্রথম তার জন্মস্থান কুষ্টিয়া জেলার ইতিহাস রচনায় উদ্যোগ গ্রহণ করেন। কুষ্টিয়া ইতিহাসের বহু মূল্যবান তথ্য তিনি অক্লান্ত পরিশ্রম করে বিভিন্ন গ্রামে গ্রামে ঘুরে সংগ্রহ করেছিলেন; কিন্তু অতীব দুঃখের বিষয় তিনি কুষ্টিয়ার ইতিহাস রচনা সম্পন্ন করে যেতে পারেননি। গীতিকার হিসেবে কবি আজিজুর রহমান এদেশের এক বিরল প্রতিভা ছিলেন। ঢাকার প্রায় প্রখ্যাত সুরকাররা যেমন আজিজুর রহমানের গানে সুর দিয়েছেন তেমন তাঁর গানও গেয়েছেন খ্যাতনামা প্রায় সব শিল্পীই। চলচ্চিত্রের জন্য তিনি অসংখ্য গান রচনা করেছেন।

রাজধানীর বুকে, হারানো দিন, আগুন্তক প্রভৃতি ছায়াছবিতে তিনি গান রচনা করেছেন। প্রধানত গানের ফসলেই তার শিল্পের গোলা ভরেছে।

এ ছাড়া 'ডাইনোসরের রাজ্যে' 'জীবজন্তুর কথা' 'আবহাওয়ার পয়লা কেতাব' তার উল্লেখযোগ্য অনুবাদগ্রন্থ। তার প্রকাশিত গ্রন্থপঞ্জির মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে 'আজাদীর বীর সেনানী : কুমারখালীর কাজী মিয়াজান', পাঁচমিশালী গানের সংকলন 'উপলক্ষের গান' দেশাত্মবোধক নিজস্ব গানের সংকলন 'এই মাটি এই মন', 'ছুটির দিনে'। ব্যক্তিগত জীবনে সৌজন্য, ভদ্রতা ও আতিথেয়তায় তিনি ছিলেন ব্যতিক্রমী মানুষ। তার সানি্নধ্যে ও সংস্পর্শে যারা এসেছেন তারা একথা অকপটে স্বীকার করবেন। বই পুস্তকাদি সংগ্রহ করা তার জীবনের নেশা ছিল।

অসুস্থ হয়ে পড়ায় ১৯৭৮ সালের পর কবির হাতে তেমন আর কলম ওঠেনি। একাকী বিছানায় শুয়ে দিন কেটেছে তার। সে সময় তিনি বিছানায় শুয়ে-শুয়ে লিখেছিলেন ‘পৃথিবীর এই পান্থশালায়, হায় পথ ভোলা কবি, জলের লেখায় বালুকাবেলায়, মিছে এঁকে গেলে ছবি’। এটাই ছিল কবির লেখা শেষ গান। অর্থাভাবে চিকিৎসাও তার ভাগ্যে জোটেনি।

১৯৭৮ সালের ৯ সেপ্টেম্বর কবি আজিজুর রহমান গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন। সে সময় তাকে ভর্তি করা হয় তৎকালীন ঢাকার পিজি হাসপাতালে। এর ৩ দিনের পর ১২ সেপ্টেম্বর শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি।

কবির জীবদ্দশায় তেমন কোনো সম্মাননা না পেলেও ১৯৭৯ সালে মরণোত্তর রাষ্ট্রীয় সম্মান ‘একুশে পদক’ লাভ করেন। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখের বিষয় এই- কবির মৃত্যুবার্ষিকীতেও কোথাও তেমন কোনো কর্মসূচি চোখে পড়ে না।

আমাদের দাবী, আজ কবি আজিজুর রহমান নেই। বহু বিচিত্র কর্মময় আদর্শবাদী, সাহসী এ ব্যক্তি আমাদের চলার পথের অনুপ্রেরণার অন্যতম আশ্রয়স্থল। আমরা তাকে স্মরণ করি এবং এ সঙ্গে তার অমস্নান স্মৃতিকে চিরস্মরণীয় করে রাখার জন্য সরকার, কবি, শিল্পী এবং বুদ্ধিজীবী সমপ্রদায়ের কাছে মিনতি রাখছি, প্রয়োজনীয় প্রচেষ্টা ও ব্যবস্থা গ্রহণের। কারণ তার উজ্জ্বল উত্তরাধিকারকে যথাযোগ্য মর্যাদার সঙ্গে বহন ও লালন-পালন করা আমাদের জাতীয় ও নৈতিক দায়িত্ব।

Add comment

Avoid comments that harm people and society.


Close

নতুন তথ্য

  • 27 May 2020
    আব্দুস সাত্তার মোহন্ত
    আব্দুস সাত্তার মোহন্ত (জন্ম নভেম্বর ৮, ১৯৪২ - মৃত্যু মার্চ ৩১, ২০১৩) একজন বাংলাদেশী মরমী কবি, বাউল...
  • 21 May 2020
    মাবরুম খেজুর (Mabroom Dates)
    মাবরুমের খেজুরগুলি এক ধরণের নরম শুকনো জাতের (আজওয়া খেজুরের মতই)। যা মূলত পশ্চিম উপদ্বীপে সৌদি...
  • 04 May 2020
    আনবার খেজুর (Anbara Dates)
    আনবার খেজুরগুলি মদীনা খেজুরগুলির মধ্যে অন্যতম সেরা। আনবারা হ'ল সৌদি আরবের নরম ও মাংসল শুকনো জাতের...
  • 04 May 2020
    আজওয়া খেজুর (Ajwa Dates)
    পৃথিবীতে অনেক জাতের খেজুর পাওয়া যায়। তাঁর মধ্যে আজওয়া খেজুর অন্যতম। তামার বা খেজুর শব্দটি আল কোরআন...
  • 27 April 2020
    মৌলভী আফছার উদ্দিন আহমদ
    মৌলভী আফসার উদ্দিন আহমদ (জন্মঃ- ১৮৮৬ মৃত্যুঃ- ২৯শে জানুয়ারী ১৯৫৯ ইং) কুষ্টিয়া জেলার অন্যতম...

আমাদের ঐতিহ্য নতুন তথ্য

Subscribe Our Newsletter

welcome to our newsletter subscription

প্রতিষ্ঠাতা এবং প্রকাশকঃ- সালেকউদ্দিন শেখ সুমন

We Bangla

Go to top