Language Switcher:

Cart empty

কুষ্টিয়া - সুকুমার বিশ্বাস

(Reading time: 4 - 7 minutes)

আমরা জানি, কুষ্টিয়ার যুদ্ধে পাকবাহিনী বাঙ্গালীদের কাছে সম্পূর্ণ পর্যুদস্ত হয় এবং মূলত কুষ্টিয়া জিলা স্কুলে অবস্থান নিয়ে যুদ্ধরত প্রায় সকল পাক-সেনাই নিহত হয়। এই পর্যায়ে বিক্ষুদ্ধ জনতার হাতে বেশকিছু অবাঙালিও প্রাণ হারায়। এদের মধ্যে কুষ্টিয়া পৌরসভার ভাইস চেয়ারম্যান অবাঙালিদের নেতা (বিহারী) নেতা নবীবক্সও ছিলো।

এসব কারণে বাঙ্গালিদের প্রতি পাক-সেনা ও বিহারীদের ক্রোধ ও প্রতিহিংসা ছিলো তীব্র। মুক্তিযুদ্ধের নয় মাসে পাকসেনা, শান্তি কমিটি, বিহারী ও রাজাকারদের হাতে কুষ্টিয়ার বিভিন্ন বয়সের ও পেশার অসংখ্য নিরীহ মানুষকে জীবন দিতে হয়।

কুষ্টিয়া পুলিশলাইনে ছিলো পাকসেনাদের ঘাঁটি। বিহারী ও রাজাকারদের সহায়তায় সন্দেহভাজন বাঙ্গালীদের এখানে ধরে আনা হতো। চলতো অকথ্য নির্যাতন। উপরে পা ঝুলিয়ে প্রহার করা হতো, হাত-পায়ের আগুলে ঢুকিয়ে দেওয়া হতো আলপিন। যাদের নাম “খরচাখাতায়” লেখা হতো, তাঁদের হস্তান্তর করা হতো রাজাকার ও বিহারীদের কাছে। হতভাগ্য এই মানুষগুলোকে নিয়ে যাওয়া হতো পার্শ্ববর্তী রেললাইনের নির্জন স্থানে। তারপর গুলি চালিয়ে কিংবা জবাই করে হত্যা করা হতো। পুলিশ লাইনের বন্দিদশা থেকেই ধরে নিয়ে গিয়ে হত্যা করা হয় অধ্যাপক দুর্গাদাশ সাহাকে।

রক্সি সিনেমা হল ছিলো শান্তি কমিটি ও বিহারী রাজাকারদের প্রধান আস্তানা। জানা গেছে শহরের হত্যা-তালিকা এখানেই প্রণীত ও কার্যকর করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হতো। বিহারীরা হতভাগ্য বন্দিদের পাশেই গড়াই নদীর চরে নিয়ে গিয়ে হত্যা করে লাশ চরে পুঁতে ফেলতো। আবার কখনও কখনও নদীর জলে ভাসিয়ে দিত রক্তাত লাশ। এইভাবেই হত্যা করা হয় কুষ্টিয়া পৌরসভার ভাইস চেয়ারম্যান আবুল কাসেমকে।

কুষ্টিয়ার শহরতলীর বিহারীঅধ্যুষিত হাউজিং এস্টেট ছিলো আর এক বধ্যভূমি। নির্মম নৃশংস গণহত্যার নীরব সাক্ষী এই হাউজিং এলাকা। শহর থেকে ধরে এনে এখানে হত্যা করা হতো। লাশগুলো কখনও পায়খানার ট্যাংক, কখনও পাশের ক্যানালে ফেলে দেওয়া হতো। হত্যা কুঠি হিসেবে ব্যবহৃত একটি ভগ্ন-জীর্ণ (হলুদ ঘর নামে পরিচিত) ঘর এখনো হাউজিং এর দক্ষিন-পূর্ব পার্শ্বে দাঁড়িয়ে আছে। হত্যা-কুঠি হিসেবে ব্যবহৃত একটি ভগ্ন-জীর্ণ ঘর এখনো হাউজিং এর দক্ষিন-পূর্ব পাশে দাঁড়িয়ে আছে। কুষ্টিয়া মহাশ্মশান, ষ্টেশন রোডের ১নং গুদাম এবং রাজারপুকুরের পার্শ্ববর্তী এলাকাও বধ্যভূমি হিসাবে ব্যবহৃত হতো। গড়াই নদীর ধারে, জুয়েল এলুমিনিয়াম ফ্যাক্টরির অভ্যন্তরে এখনো কালের সাক্ষী হয়ে রয়েছে একটি তেঁতুলগাছ। ইংরেজি ভি অক্ষরের মতো এর দুটি বিস্তারিত শাখার মাঝখানে জোর করে মাথা চেপে রেখে ধারালো অস্ত্র দিয়ে হত্যা করা হতো।

মিলপাড়ার কোহিনুর বেকারির মালিককে স্ব-পরিবার নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়। শহরের বিশিষ্ট ব্যক্তিদের মধ্যে হাসান ফয়েজ, আনছার আলী, ননী গোপাল রায়, রফিক আহমদ, ফুটবলার সোহরাওয়াদীকে এভাবেই হত্যা করা হয় বলে জানা যায়।

কুষ্টিয়া সম্পর্কে “পূর্বদেশ” প্রতিনিধি ১৯৭২ সালেই লিখলেনঃ

…বর্বর পাকসেনা ও তাঁদের অনুচরেরা গড়াই নদীর ধার দিয়ে গঙ্গা কপোতাক্ষ ঘাট থেকে শ্মশানঘাট পর্যন্ত দেড় মাইল এলাকার মধ্যে প্রায় পাঁচ-ছয় হাজার বাঙালী নরনারীকে হত্যা করে তাঁদেরকে নদীতে ফেলে দিয়েছিল। সেই সমস্ত হতভাগ্য মানব সন্তানের হাড়গোর এখনো নদীতে গোসল করতে গেলে মাঝে মাঝে মানুষের পায়ে বাঁধে। কুষ্টিয়া শহরের আমলাপাড়ায় বিমান নন্দীর বাড়ি বলে পরিচিত একটি বাড়িতে বর্বররা স্থাপন করেছিল বধ্যভূমি। এখনো সেটা জনসাধারণের কাছে “ফাঁসিঘর” বলে পরিচিত।

সেখানে হত্যার নিদর্শন ফাঁসির দড়ি কয়েকদিন আগেও ঝুলছিল। শহরের আর একটি বধ্যভূমি হচ্ছে কুষ্টিয়া হাউজিং কলোনী। এইসব গ্রাম থেকে কিশোর-তরুনী সমস্ত বয়সের মেয়েদের ধরে নিয়ে সেখানে তাঁদের আটকে রেখে চালাতো অমানবিক পাশবিক অত্যাচার। তাঁদের এই অত্যাচারের হাত থেকে বিধবা, পঙ্গু, মেয়েরাও বাদ পড়েনি। এমনকি মাত্র চারদিনের প্রসূতিও তাঁদের পাশবিকতার হাত থেকে রক্ষা পায়নি।

আরো আছে চলবে…

Add comment


Security code
Refresh

Close

নতুন তথ্য

নতুন তথ্য

Subscribe Our Newsletter

welcome to our newsletter subscription

প্রতিষ্ঠাতা এবং প্রকাশকঃ- সালেকউদ্দিন শেখ সুমন

Made in Bangla

Go to top