প্রয়োজনে ফোন করুন:
+88 01978 334233

ভাষা পরিবর্তনঃ

Cart empty
  • Lalon Song Cloud

লিচুর উপকার এবং অপকারিতা

(পড়তে সময় লাগবেঃ-: 7 - 13 minutes)

The benefits and disadvantages of litchi

লিচু বা লেচু (বৈজ্ঞানিক নাম Litchi chinensis) একটি নিরক্ষীয় ও ক্রান্তীয় অঞ্চলের ফল। লিচুর ফল রসালো। বাংলাদেশে এটি গ্রীষ্মকালীন ফল এবং এখানে ফেব্রুয়ারিতে এর মুকুল আসে ও ফল সাধারনত মে মাসের দিকে পাকে। বাংলাদেশের সব স্থানেই লিচু হয়, তবে উত্তরবঙ্গের রাজশাহী ও দিনাজপুর অঞ্চলে এর ভাল ফলন হয়। এই এলাকার মঙ্গলবাড়িয়া লিচু বড় আকার ও সুস্বাদের জন্য বিশেষ জনপ্রিয়।

লিচুর ব্যাস সাধারণত ১-১.৫ ইঞ্চি। গাছ ১০-৩৫ ফুট উচ্চতা বিশিষ্ট হয়ে থাকে।

লিচু হলো সেপিন্ডাসিয়া পরিবারের লিচি গণের একমাত্র সদস্য। এটি নিরক্ষীয় ও উপ-নিরক্ষীয় অঞ্চলে জন্মে থাকে। এর আদি নিবাস চীনে। বাংলাদেশ ছাড়াও ভারত, মায়ানমার, ভিয়েতনাম, ফিলিপাইন, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া, ব্রাজিল সহ বিশ্বের কর্কটক্রান্তি ও মকরক্রান্তিয় বহু দেশে লিচু চাষ করা হয়।

লিচুতে রয়েছে সামান্য পরিমাণে প্রোটিন ও ফ্যাট যা মানব দেহের জন্য প্রয়োজন। প্রতি ১০০ গ্রাম লিচুতে রয়েছে ১.১ গ্রাম প্রোটিন এবং ০.২ গ্রাম ফ্যাট। লিচুতে পর্যাপ্ত পরিমাণে শ্বেতসার পাওয়া যায়। প্রতি ১০০ গ্রাম লিচুতে ১৩.৬ গ্রাম শ্বেতসার থাকে।এছাড়া লিচুতে ০.০২ গ্রাম ভিটামিন বি ১ এবং ০.০৬ গ্রাম বি ২ রয়েছে। এছাড়াও এতে কিছু পরিমাণে খনিজ লবণ থাকে। প্রতি ১০০ গ্রাম লিচুতে ০.৫ গ্রাম খনিজ লবণ পাওয়া যায়।

লিচুতে রয়েছে ভিটামিন ‘সি’ যা ত্বক, দাঁত ও হাড়ের জন্য ভালো। প্রতি ১০০ গ্রাম লিচুতে ৩১ মি.গ্রা ভিটামিন সি পাওয়া যায়। নানারকম চর্মরোগ ও স্কার্ভি দূর করতে সাহায্য করে ভিটামিন সি। তাছাড়া এটি ত্বক উজ্জ্বল করতে ও বলিরেখা কমাতেও সাহায্য করে। প্রতি ১০০ গ্রাম লিচুতে ১০ মি.গ্রা ক্যালসিয়াম রয়েছে। ক্যালসিয়াম দেহের হাড় গঠন করে ও হাড়ের সুস্থতা বজায় রাখতে সাহায্য করে। লিচুতে অল্প পরিমাণে লৌহ পাওয়া যায়। প্রতি ১০০ গ্রামে ০.৭ মি.গ্রা লৌহ।

এছাড়াও লিচুতে রয়েছে থিয়ামিন, নিয়াসিন ইত্যাদি, যা লিচুর পুষ্টিগুণ আরও বৃদ্ধি করে। এসব ভিটামিন শরীরের বিপাক ক্ষমতা বাড়ায়। শক্তির ভালো উৎস লিচু। প্রতি ১০০ গ্রাম লিচু থেকে ৬১ কিলোক্যালরি শক্তি পাওয়া যায়। এটি শরীরের কোলেস্টেরলের মাত্রা কমায়। পাশাপাশি চর্বি কমাতে সাহায্য করে।

আমাদের দেশে লিচু নিয়ে অনেক ধরণের মজার ঘটনা ঘটে থাকে। আর বোধহয় সে কারণেই আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম “লিচু চোর” কবিতাটি লিখেছিলেন।

লিচু চোর – কাজী নজরুল ইসলাম

বাবুদের তাল-পুকুরে
হাবুদের ডাল-কুকুরে
সে কি বাস করলে তাড়া,
বলি থাম একটু দাড়া।

পুকুরের ঐ কাছে না
লিচুর এক গাছ আছে না
হোথা না আস্তে গিয়ে
য়্যাব্বড় কাস্তে নিয়ে
গাছে গো যেই চড়েছি
ছোট এক ডাল ধরেছি,

ও বাবা মড়াত করে
পড়েছি সরাত জোরে।
পড়বি পড় মালীর ঘাড়েই,
সে ছিল গাছের আড়েই।
ব্যাটা ভাই বড় নচ্ছার,
ধুমাধুম গোটা দুচ্চার
দিলে খুব কিল ও ঘুষি
একদম জোরসে ঠুসি।

আমিও বাগিয়ে থাপড়
দে হাওয়া চাপিয়ে কাপড়
লাফিয়ে ডিঙনু দেয়াল,
দেখি এক ভিটরে শেয়াল!
ও বাবা শেয়াল কোথা
ভেলোটা দাড়িয়ে হোথা
দেখে যেই আঁতকে ওঠা
কুকুরও জাড়লে ছোটা!
আমি কই কম্ম কাবার
কুকুরেই করবে সাবাড়!

‘বাবা গো মা গো’ বলে
পাঁচিলের ফোঁকল গলে
ঢুকি গিয়ে বোসদের ঘরে,
যেন প্রাণ আসলো ধড়ে!

যাব ফের? কান মলি ভাই,
চুরিতে আর যদি যাই!
তবে মোর নামই মিছা!
কুকুরের চামড়া খিঁচা
সেকি ভাই যায় রে ভুলা-
মালীর ঐ পিটুনিগুলা!
কি বলিস ফের হপ্তা!
তৌবা-নাক খপ্তা…!

লিচু খাওয়ার উপকারিতাগুলি কী কীঃ-

  1. ওজন কমাতেঃ লিচুতে প্রচুর ফাইবার এবং ভিটামিন বি কমপ্লেক্স থাকে। যা মেটাবলিজম বা বিপাক ক্রিয়া বৃদ্ধিতে সাহায্য করে। মেটাবলিজম শক্তি কম হলেই মানুষের দেহে চর্বি বেড়ে যায়। লিচু এই মেটাবলিজম বৃদ্ধিতে দারুণ ভূমিকা পালন করে। ফলে শরীরে অতিরিক্ত ওজন হ্রাসে সাহায্য করে।
  2. রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি করেঃ লিচু ভিটামিন ‘সি’ এর একটি অসাধারণ উৎস। প্রচুর ভিটামিন ‘সি’ সাথে অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট থাকার কারণে লিচু বেশ কিছু রোগ প্রতিরোধ করে। যেমনঃ সর্দির সমস্যা, ফ্লু, কাশি। এছাড়াও বিভিন্ন সংক্রমণ থেকে রক্ষা পেতে লিচু কার্যকরী একটি ফল।
  3. বুড়িয়ে যাওয়া থেকে রক্ষা করেঃ সময়ের সাথে মানুষ বৃদ্ধ হয় স্বাভাবিক। কিন্তু বর্তমানে দূষণ, কালো ধোঁয়া, ভেজাল খাদ্য সহ আরো নানা কারণে মানুষ খুব দ্রুত বুড়িয়ে যাচ্ছে। মুখে বয়সের ছাপ আসার যে প্রধান কারণ তা আমাদের শরীরে উৎপন্ন হওয়া ফ্রি রেডিকেল। এই ফ্রি রেডিকেল রোধ করতে সবচেয়ে কর্মক্ষম হচ্ছে অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট। একটি গবেষণায় দেখা গেছে, যারা প্রচুর পরিমাণে অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট সমৃদ্ধ ফল খায় তাদের চেহারায় বয়সের ছাপ কম পড়ে। লিচুর মধ্যে প্রচুর পরিমাণে অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট থাকায় এটি ত্বককে বুড়িয়ে যাওয়ার হাত থেকে রক্ষা করে।
  4. হৃদরোগ থেকে রক্ষা করেঃ The Journal of Nutrition এর মতে, লিচুতে প্রায় ১৫% polypheols আছে যা এটিকে polyphenols সমৃদ্ধ ফলের মধ্যে দ্বিতীয় আসনে রেখেছে। অন্যান্য যে সব ফল পরীক্ষা করা হয়েছে তার মধ্যে লিচু হৃদযন্ত্র ভাল রাখতে অন্যান্য ফলের চেয়ে বেশি উপকারী। লিচু শরীরের খারাপ ধরণের কোলেস্টেরল (LDL) কমায় এবং ভাল কোলেস্টেরল (HDL) এর মাত্রা বাড়ায়। ফলে এতে হৃৎপিণ্ডের রক্তসঞ্চালন প্রক্রিয়া ঠিক থাকে এবং হার্ট এটাক, স্ট্রোক ও হাইপার টেনশনের ঝুঁকি কমে। আগ্রহী পাঠকদের জন্যে বলে রাখা ভাল, polypheols থাকা ফলের মধ্যে ১ম স্থান অধিকার করেছে আঙুর।
  5. কোষ্ঠকাঠিন্য রোধ করেঃ লিচুতে প্রচুর দ্রবণীয় ফাইবার থাকার কারণে অন্ত্রের বিভিন্ন সমস্যা রোধ করে। এছাড়া লিচু পাকস্থলি এবং কোলন পরিষ্কার রাখতে সাহায্য করে। ফলে এটি কোষ্ঠকাঠিন্য রোধে কার্যকর ভূমিকা পালন করে। দীর্ঘদিন ধরে কোষ্ঠকাঠিন্যের রোগে যারা ভুগছেন তাদের জন্যে লিচু যে খুব উপকারী হবে এতে সন্দেহের কোন অবকাশ নেই।

লিচু খাওয়ার অপকারিতা কি কিঃ-

লিচু মৌসুমী ফল হিসেবে বেশ জনপ্রিয় হলেও, ভারত ও বাংলাদেশে কিছু এলাকায় শিশুর মৃত্যুর কারণ হিসাবে লিচু থেকে বিষক্রিয়ার প্রমাণ পেয়েছেন বিজ্ঞানীরা। তারা বলছেন, ভারতের বিহার রাজ্য এবং বাংলাদেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে অনেক শিশুর মৃত্যুর কারণ এটি।

আন্তর্জাতিক চিকিৎসা বিজ্ঞান পত্রিকা 'ল্যানচেট'-এর সাম্প্রতিক সংখ্যায় প্রকাশিত একটি গবেষণা পত্রে এই তথ্য উঠে এসেছে।

খালি পেটে অনেকগুলি লিচু খেয়ে ফেললে শরীরে যে বিষ তৈরি হয়, তার ফলেই সুস্থ-সবল শিশুদের হঠাৎ খিঁচুনি আর বমি শুরু হয়। তারপরেই অজ্ঞান হয়ে পড়ে তারা। আর এভাবে আক্রান্ত হওয়া অর্ধেকেরও বেশি শিশু মারা যায়।

বিহারে 'লিচু রোগ' বা বাংলাদেশের কোথাও কোথাও 'অজানা কীটনাশকের প্রয়োগ'-কেই এসব শিশুমৃত্যুর কারণ বলে মনে করা হতো এতদিন। কিন্তু এখন দেখা যাচ্ছে যে মৃত্যুর কারণটা লুকিয়ে থেকেছে 'লিচু' ফলের মধ্যেই।

লিচুতে হাইপোগ্লাইসিন নামে একটি রাসায়নিক থাকে, যা শরীরে শর্করা তৈরি রোধ করে। খালি পেটে অতিরিক্ত লিচু খেয়ে ফেললে শিশুদের শরীরে শর্করার পরিমাণ অত্যন্ত কমে গিয়ে তা মৃত্যুর কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

বিহারের ঘটনায় বিজ্ঞানীরা প্রত্যেকটি শিশুর চিকিৎসা সংক্রান্ত তথ্য খুঁটিয়ে দেখে এই সিদ্ধান্তে এসেছেন যে ওই বাচ্চাগুলি আগের রাতে খাবার খায় নি অথবা কম খেয়েছিল। পরের দিন রাস্তায় পরে থাকা, নষ্ট হয়ে যাওয়া অথবা অপরিপক্ব লিচু একসঙ্গে অনেকগুলি খেয়ে ফেলেছিল তারা। তারপরেই অসুস্থ হয়ে পড়ে বাচ্চাগুলি।

মে থেকে জুলাই মাসেই লিচুর ফলন হয়ে থাকে। আর ওই সময়েই শিশুরা ওই উপসর্গ নিয়ে মারাও যায় সবথেকে বেশী।

বিজ্ঞানীরা বলছেন, অপরিপক্ব লিচু বা লিচুজাতীয় ফল খেয়েই যে বিষক্রিয়ায় বহু শিশু মারা যায়, সেটা অনেক দিন আগেই ক্যারিবিয়ান দ্বীপে গবেষণায় জানা গিয়েছিল।

এরপর 'জামাইকান ভমিটিং সিকনেস' নামের ওই রোগটির ব্যাপারে বিস্তারিত তথ্য ভারত ও বাংলাদেশ সহ এশিয়ার কয়েকটি অঞ্চলে পৌঁছাতে অনেক দেরী হয়েছে, বলছে 'ল্যানচেট'।

মন্তব্য

মানুষ এবং সমাজের ক্ষতিসাধন হয় এমন মন্তব্য হতে বিরত থাকুন।


Close

নতুন তথ্য

  • 28 মে 2020
    শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন
    জয়নুল আবেদিন (জন্মঃ- ২৯ ডিসেম্বর ১৯১৪ - মৃত্যুঃ- ২৮ মে ১৯৭৬ ইংরেজি) বিংশ শতাব্দীর একজন বিখ্যাত...
  • 28 মে 2020
    উকিল মুন্সী
    উকিল মুন্সী (১১ জুন ১৮৮৫ - ১২ ডিসেম্বর ১৯৭৮) একজন বাঙালি বাউল সাধক। তার গুরু ছিলেন আরেক বাউল সাধক...
  • 27 মে 2020
    আব্দুস সাত্তার মোহন্ত
    আব্দুস সাত্তার মোহন্ত (জন্ম নভেম্বর ৮, ১৯৪২ - মৃত্যু মার্চ ৩১, ২০১৩) একজন বাংলাদেশী মরমী কবি, বাউল...
  • 21 মে 2020
    মাবরুম খেজুর (Mabroom Dates)
    মাবরুমের খেজুরগুলি এক ধরণের নরম শুকনো জাতের (আজওয়া খেজুরের মতই)। যা মূলত পশ্চিম উপদ্বীপে সৌদি...
  • 04 মে 2020
    আনবার খেজুর (Anbara Dates)
    আনবার খেজুরগুলি মদীনা খেজুরগুলির মধ্যে অন্যতম সেরা। আনবারা হ'ল সৌদি আরবের নরম ও মাংসল শুকনো জাতের...

নতুন তথ্য

Subscribe Our Newsletter

welcome to our newsletter subscription

প্রতিষ্ঠাতা এবং প্রকাশকঃ- সালেকউদ্দিন শেখ সুমন

We Bangla

Go to top