প্রয়োজনে ফোন করুন:
+88 01978 334233

ভাষা পরিবর্তনঃ

Cart empty

খোকসার পরিচয়

খোকসা বাংলাদেশের কুষ্টিয়া জেলার একটি ক্ষুদ্রতম থানা। ১৯৪৭ সালের পুর্বে বর্তমান খোকসা থানা ছিলো অবিভক্ত বাংলাদেশের প্রেসিডেন্সী বিভাগের অন্যতম নদীয়া জেলার কুষ্টিয়া মহকুমার অংশ। খোকসার যতদুর প্রাচীন ইতিহাস জানা যায়, তাতে করে দেখা যায়, নবাব মুর্শীদ কুলী খাঁর নবাবী আমলের শেষদিকে খোকসা ছিলো বর্তমান ঝিনাইদহ জেলার কালীগঞ্জ থানার নলডাঙ্গা জমিদারের অধীনে।

১৮২৭ সালে খোকসা থানা যশোর জেলা থেকে পাবনা জেলার অন্তর্ভুক্ত হয় আর ১৮৫৭ সালে খোকসা থানাকে কুমারখালী ( পাবনা জেলা ) অধীনে আনা হয়। আবার ১৮৭১ সালে খোকসা থানাকে নদীয়া জেলার কুষ্টিয়া মহকুমা ভুক্ত করা হয়।

খোকসা থানা উত্তর দিকে পদ্মা নদী পর্যন্ত বিস্তৃত। ইহার পশ্চিম দিকে কুমারখালী (কুষ্টিয়া) থানা। বর্তমান ঝিনাইদহ জেলার শৈলকুপা থানা এই থানার দক্ষিন-পশ্চিম এবং ফরিদপুর জেলার পাংশা থানা উত্তর পুর্বদিকে অবস্থিত। পোড়াদহ থেকে পুর্বদিকে প্রবাহিত গোয়ালন্দ ব্রডগেজ রেললাইন এই থানাকে বিভক্ত করেছে। পদ্মার শাখা গড়াই নদীও খোকশা থানার ভেতর দিয়ে প্রবাহিত।

খোকসা থানার নামকরনের যথার্থ কোন ইতিহাস পাওয়া যায়নি। কিংবদন্তী থেকে জানা যায়, বর্তমান খোকসার কালী নাকি জনৈক তান্ত্রিক সাধুর দ্বারা প্রতিষ্ঠিত। সেই নৈষ্ঠ্যিক আত্তপ্রচার বিমুখ তান্ত্রিক সাধুটি গড়াই নদীর তীরে খোকসা গাছ দ্বারা বেষ্টিত একটি নির্জন স্থানে প্রথম কালী পূজা আরম্ভ করে। এই নির্জন জঙ্গলাকীর্ণ স্থানে সে সময় কেই যেত না জনৈক জমিদার পুত্রের সর্প দংশনের পর অজ্ঞানাবস্থায় এই কালী সাধকের নিকট আনা হয় এবং উক্ত সাধক সংজ্ঞাহীন যুবকটিকে কালীর পদতলে শুইয়ে দিয়ে দুয়ার বন্ধ করে দেয়। অতঃপর সাধকের সাধনায় কালীর কৃপায় যুবকটি বেঁচে উঠে। যাবতীয় খবর পেয়ে জমিদার আসেন এবং পুত্রকে ফিরে পেয়ে কালীর প্রতি ভক্তি-আপ্লুত হয়ে উঠেন। তারপর তান্ত্রিক সাধুর নির্দেশমত জমিদার মাঘী আমাবশ্যায় এক রাতে সাড়ম্বরে কালীর পূজা দেন। সেই থেকে খোকসা গাছ বেষ্টিত এই কালীর নামহয় ‘খোকসার কালী’ এবং উক্ত স্থানও খোকসা নামে পরিচিত হয়ে ওঠে।

খোকসা থানার আয়তন ২৪৩২০ একর। ভু-প্রকৃতি বান্ধব। মাটিও মিশ্র প্রকৃতির। এটেল ৫৫ ভাগ, দোআঁশ ২৫ ভাগ, বেলে ১৫ ভাগ, এবং জল ৫ ভাগ। আয়তনের দিক থেকে খোকসা থানা খুবই ক্ষুদ্র। এই থানার ১৯৮১ সালের আদমশুমারী অনুসারে লোকসংখ্যা ৮১৫৭৮ জন। তন্মধ্যে পুরুষ ৪২২৮২ জন এবং স্ত্রীলোক ৩৯২৯৬ জন।

খোকসা থানায় বর্তমানে দশটি ইউনিয়ন। মৌজার সংখ্যা ৮৪টি , গ্রাম ৯৬টি, বাড়ী ১৩১২৯টি (১৯৮১)। ঘরগুলির অধিকাংশই ছনের। কিছু টিনের ঘরও আছে। গ্রামে কদাচিৎ দুই একটি পাকা গৃহ দেখতে পাওয়া যায়। অধিকাংশ পাকা গৃহগুলি থানার কেন্দ্রে অবস্থিত।

খোকসা থানায় দুইটি নদী গড়াই এবং হাওড়। হাওড় নদী গড়াই থেকেই উৎপত্তি হয়েছে এবং গড়াইতেই বিলীন হয়েছে। গড়াই একটি প্রাচীন নদী। গড়াইয়ের প্রাচীনত্বের সাক্ষর রয়েছে মুকুন্দরামের চন্ডীমঙ্গল কাব্যে। কবি স্বদেশ ত্যাগের সময় এই কাব্যের ভূমিকায় বলেনঃ-

‘বহিয়া গড়াই নদী - সদাই স্মরিয়ে বিধি
তেঁউট্যায় হইলু উপণীত।
দারুকেশ্বর তরি – পাইল বাত্তনগিরি
গঙ্গাদাশ বড় কৈলাহিত ৷৷’

কুষ্টিয়া শহর, কুমারখালী ও জানিপুর বাঁচাতে গড়াইয়ের এখন অন্তিম দশা। শহরের উজানে বাঁধ দেওয়াতে শহর রক্ষা পেয়েছে কিন্তু নদী রক্ষা পাচ্ছে না। এখন গ্রীষ্মকালে গড়াইয়ের উপর দিয়ে লোক হেটে পার হয়। এই গড়াইয়ের পুর্ব তীরে খোকসা থানার কেন্দ্রীয় শহর খোকসা জানিপুর এবং খোকসা কালী বাড়ী অবস্থিত।

খোকসার পুরাকীর্তির মধ্যে খোকসার কালী বাড়ীতে সংরক্ষিত কৃষ্ণবর্নের একখন্ড প্রাচীন প্রস্থর অন্যতম। এই প্রস্থরখানি নলডাঙ্গার রাজা ইন্দুভূষন দেবরায় গড়াই নদী হতে প্রাপ্ত হন বলে জানা যায়। প্রস্থরখানি বৌদ্ধ আমলের নিদর্শন। প্রস্থরখানি দীর্ঘদিন মন্দির চত্তরে পড়ে ছিলো। ফুলবাড়ীর মঠও খোকসার পুরাকীর্তির নিদর্শন। পাঠান রাজত্বের শেষ ভাগে অথবা মোঘল রাজত্বের প্রথম দিকে ব্রজবল্লভ ক্রোড়ী নামে একজন বৈষ্ণব মতাবলম্বী ধনী ব্যবসায়ী এই মন্দিরটি নির্মান করেন, রাধারমন বিগ্রহ স্তাহপন করেন। ফুলবাড়ী খোকসা ষ্টেশন থেকে তিন মাইল উত্তরে অবস্থিত।

ফুলবাড়ীর মঠ ও মন্দির সম্পর্কে ১৩৪৩ সালে ‘ভারতবর্ষ’ পত্রিকায় তারপদ দাশ নামে একজন লেখক লিখেছিলেন – ফুলবাড়ী মঠের প্রধান মন্দির গৃহটি পাবনার জোড়বাংলার মন্দির ধরনের। এই মন্দিরের দেওয়ালের গাত্রে ও শিরোভাগে বহু দেবদেবীর বিচিত্র মুর্তি দেখতে পাওয়া যায়। সনাল পদ্ম ও লতাপাতা খোদিত হইয়াছে। মঠের পশ্চিম দিকে বিরাট টিবির উপর যে বাড়ী আছে সেখানে ছিলো ব্রজবল্লভ ক্রোড়ীর বাড়ী। পরে ব্রজবল্লভ ক্রোড়ী ফরিদপুর জেলার মেঘনা গ্রামের বাসিন্দা হন।

খোকসায় অনুষ্ঠিত মেলার মধ্যে খোকসার কালীপূজার মেলা সম্পর্কে কুষ্টিয়া ইতিহাস গ্রন্থে উল্লেখ আছে। সেকালে কুষ্টিয়া জেলায় অনেকগুলী বড় আকারের মেলা হত। এসব মেলার মধ্যে খোকসার কালী পূজার মেলা উন্নতম। কুষ্টিয়ার খোকসার কালী পূজার মেলা মাঘ মাসে সাত দিন ধরে হয়। বিরাটাকার কালী মুর্তির সামনে পাঠা ও মহিষ বলি হয়। বহু দূর দুরান্ত থেকে অসংখ্য ভক্ত এ মেলায় জমায়েত হয়।

খোকসার আশ্রমের মধ্যে অন্যতম শ্রীশ্রী রাধারমন সাধনাশ্রম। এই আশ্রমটি ১৯৩০ সালে শ্রীরাজপুর গ্রামে বিখ্যাত নেতা যতীন্দ্র মোহন কর এম.এ এর উদ্দোগে গড়ে উঠে। যতীন্দ্র মোহন কর ছিলেন মহাত্মা গান্ধীর ভাবশিষ্য এবং নদীয়া জেলার কংগ্রেসের সভাপতি। তিনি এখানে একটি অবৈতনিক বিদ্যালয় ও ছাত্রাবাস স্থাপন করেন। প্রথম বছর চৌদ্দ জন ছাত্র এখানে ভর্তি হয়। এই আশ্রমটিও দেশ বিভাগের পূর্ব পর্যন্ত চালু ছিলো।

কমলাপুরের কালী কানন্দ ব্রম্মচারীর ( শ্যাম সাধু ) আশ্রমটিও উল্লেখযোগ্য। এই আশ্রমটির প্রাকৃতিক পরিবেশ খুবই সুন্দর।

খোকসা থানার উত্তরাংশে দরবেশ খাকী দেওয়ানের অলৌকিক কাহিনী সম্পর্কে বহু কিংবদন্তী প্রচলিত আছে। দরবেশ খাকী দেওয়ান ও দরবেশ চিকনাই দেওয়ানের মাজার খোকসা ষ্টেশনের পাঁচ মাইল উত্তরে উথলী নামক গ্রামে অবস্থিত।

খোকসার প্রসিদ্ধ ব্যাক্তিদের মধ্যে অধ্যাক্ষ হেরম্ব মৈত্র অন্যতম। তিনি ইংরেজিতে এম.এ পাস করে কলিকাতার সিটি কলেজের অধ্যাপক পরে অধ্যাক্ষ হন। তার জন্ম সাল ১৮৫৮ পৈতৃক নিবাস খোকসা থানার হিজলাবট গ্রামে । তিনি সঞ্জীবন নামে একখানি পত্রিকা প্রকাশ করতেন। তার মৃত্যুর পর তার লেখা প্রবন্ধগুলি পুত্র ব্যারিষ্টার অশোক মৈত্র “Thought on the great quest” নামে প্রকাশ করেন। অশোক মৈত্র বিখ্যাত সিনেমা অভিনেত্রী কানন বালা দেবীকে বিয়ে করেন। হেরম্ব মৈত্রের কন্যা নির্মল কুমারী মহলানবিস রবীন্দ্রনাথের অত্যান্ত ঘনিষ্ট ছিলেন এবং রবীন্দ্রনাথের স্মৃতিচারণ উপলক্ষে “ বাইশে শ্রাবন” নামে একখানি গ্রন্থ প্রকাশ করেন।

খোকসার অন্যান্য সাহিত্যসেবীদের মধ্যে অধ্যাপক জ্যৌতিপ্রকাশ দত্তের নাম উল্লেখযোগ্য। তিনি তিনি খোকসা থানার আমলাবাড়ী নামক গ্রামে জন্মগ্রহন করেন। তিনি বর্তমানে আমেরিকার একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনার কাজে নিযুক্ত আছেন। তার উপন্যাসের নাম কুয়াশা (১৯৫৮) দুবিনীত কাল (১৯৬৭) বহেনা সুবাতাস (১৯৬৭) এবং সীতাংশু তোর সমস্ত কথা (১৯৬৯)।

শিবনাথ সাহা খোকসা থানার একজন উল্লেখ যোগ্য গায়ক। তিনি খোকাসা থানার জানিপুরে জন্মগ্রহন করেন। রবীন্দ্রনাথ অনেকবার জানিপুরে এসে শিবনাথ সাহার কীর্তন শুনেছেন। রবীন্দ্রনাথ তাকে কলিকাতা নিয়ে যান এবং কলিকাতা বেতারে গান গাওয়ার সুযোগ করে দেন। এতদ্ব্যাতীত খোকসা থানার ইচলাট গ্রামের কুমুদ বন্ধু বিশ্বাসও রামায়ন গায়ক হিসাবে বঙ্গ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পরিচিত।

খোকসার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য যেমন নয়নাভিরাম তেমন মনোমুগ্ধকর। হাওড় গড়াই বিল ও মাঠের ধারে গ্রামগুলি অবস্থিত। গ্রামগুলি ছায়াঢাকা পাখিডাকা শান্তির নীড়। কেন্দ্রীয় শহর খোকসা জানিপুর গ্রাম ও শহরের সেতুবন্ধন। এক কথায় প্রাকৃতিক ও মানব প্রাকৃতির বৈচিত্রে ও বৈভবে খোকসা থানা সমৃদ্ধ ও সুন্দর। খোকসার মুল্য আকৃতিতে নয় – প্রকৃতিতে।

মন্তব্য

মানুষ এবং সমাজের ক্ষতিসাধন হয় এমন মন্তব্য হতে বিরত থাকুন।


নতুন তথ্য

সৃষ্টিশীল কারিগর কবি ও স্থপতি রবিউল হুসাইন রবিউল হুসাইন (জন্মঃ ৩১ জানুয়ারি ১৯৪৩ সাল - মৃত্যুঃ ২৬ নভেম্বর, ২০১৯ সাল ইংরেজি) সৃষ্টিশীল কারিগর তিনি একাধারে কবি, স্থপতি,...
বাংলা গানের অমর গীতিকবি এবং সংগীতস্বাতী -  মাসুদ করিম মাসুদ করিম ( জন্মঃ ১৭ ফেব্রুয়ারি, ১৯৩৬ - মৃত্যুঃ- ১৬ নভেম্বর, ১৯৯৬) ছিলেন একজন খ্যাতিমান...
কুষ্টিয়ার মোহিনী মিলের ঐতিহ্য নতুন রুপে ফিরে আসুক আগামী প্রজন্মের কাছে এক সময়ের এশিয়ার সর্ববৃহৎ ঐতিহ্যবাহী বস্ত্রকল কুষ্টিয়ার মোহিনী মিল আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ব্যাপক...
ভাঙল কুষ্টিয়ায় বাউল সম্রাট ফকির লালন শাহ্‌ এর তিরোধান দিবসের ৩ দিনের অনুষ্ঠান কুষ্টিয়ার ছেউড়িয়ায় সাঙ্গ হলো বাউল সম্রাট ফকির লালন শাহ’র ১২৯তম তিরোধান দিবস অনুষ্ঠান। “বাড়ির কাছে...
লালনের আদর্শে আধুনিক দেশ ও সমাজ গড়ে তুলতে হবে জাতীয় সংসদ সদস্য ও বাংলাদেশ আওয়ামীলীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুবউল আলম হানিফ বলেছেন, সবকিছুর...

নতুন তথ্য

কুষ্টিয়া জেলা পরিষদের ইতিহাস ১৮১৬ এবং ১৮১৯ সালের স্থানীয়ভাবে ফেরী ব্যবস্থাপনা ও রক্ষনাবেক্ষণ, সড়ক/ সেতু নির্মাণ ও মেরামতের জন্য বৃটিশ সরকার...
সাঁতারে বিশ্ব রেকর্ড সৃষ্টিকারী কানাই লাল শর্মা কানাই লাল শর্মা (জন্মঃ ৭ই নভেম্বর ১৯৩০ইং, মৃত্যুঃ ১৯শে আগস্ট ২০১৯ইং) কুষ্টিয়ার হাটস হরিপুর ইউনিয়নের শালদহ গ্রামে...
Photo credit: Najmul Islam - Golden Bangla বাংলাদেশের সব চাইতে বেশী সুখী মানুষের বসবাস এবং ১৩তম বড় শহর কুষ্টিয়া শহর। সকল ফসল উৎপাদনে সক্ষম কুষ্টিয়ার মানুষ। নদী-নালা,...
সংগীতশিল্পী খালিদ হোসেন খালিদ হোসেন (জন্মঃ- ৪ ডিসেম্বর ১৯৩৫ - মৃত্যুঃ- ২২ মে ২০১৯) ছিলেন একজন বাঙালি নজরুলগীতি শিল্পী এবং নজরুল গবেষক। তিনি নজরুলের ইসলামী গান...
হয়রত সোলাইমান শাহ্‌  চিশতী (রঃ) মাজার শরীফ আধ্যাত্মিক সাধক পুরুষ সোলাইমান শাহ। কুষ্টিয়ার ভেড়ামারা উপজেলার গোলাপ নগরে রয়েছে সোলাইমান শাহের...

Subscribe Our Newsletter

welcome to our newsletter subscription

প্রতিষ্ঠাতা এবং প্রকাশকঃ- সালেকউদ্দিন শেখ সুমন

Made in kushtia

Go to top